বাণিজ্য যুদ্ধে চীনকে হারাতে যেভাবে এগুচ্ছেন ট্রাম্প

নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অবশ্য তা নিছক রাজনৈতিক চটকদারি ছিল নাকি সত্যিই চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণের সাহস দেখাবেন ট্রাম্প- সেটাও ছিল দেখার বিষয়।
তবে তিনি যে ‘এক কথার মানুষ’’ এবং চীনের বিরুদ্ধে সত্যি সত্যিই কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছেন, তার লক্ষণ এরমধ্যেই দেখা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর যাদের নিয়ে হোয়াইট হাউজ প্রশাসন সাজাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাদের বেশির ভাগই কট্টর চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত। ফলে ট্রাম্পের আমলে সামনের দিনগুলোতে মার্কিন চীন সম্পর্কে আরও শীতল এবং অনেক বেশি সংকটময় হয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) সিআইএ প্রধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্সের সাবেক পরিচালক জন র্যাটক্লিফকে মনোনীত করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এছাড়া ফক্স নিউজের উপস্থাপক ও সাবেক সেনা সদস্য পিট হেগসেথকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ফ্লোরিডার কংগ্রেস সদস্য মাইকেল ওয়াল্টজকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মনোনীত করেন তিনি।
এর আগে জাতিসংঘে মার্কিন দূত হিসেবে নিউইয়র্ক থেকে নির্বাচিত নিম্নকক্ষ সদস্য এলিস স্টেফানিককে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ফ্লোরিডার সিনেটর মার্কো রুবিওকে মনোনীত করেন ট্রাম্প। এই পাঁচজনের ব্যাকগ্রাউন্ড ভিন্ন ভিন্ন হলেও একটি ক্ষেত্রে তাদের মিল রয়েছে। তারা প্রত্যেকেই কট্টর চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত। চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করেন তারা এবং বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করার পক্ষপাতী।
শুধু এই পাঁচজনই নয়, ট্রাম্পের প্রশাসনে আরও যেসব চীনবিরোধী ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে; তাদের মধ্যে রয়েছেন জার্মানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রিচার্ড গ্রেনেল, টেনেসির সিনেটর বিল হ্যাগার্টি এবং সাবেক মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট লাইথিজার। এর মধ্যে লাইথিজারকে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের ‘ট্রেড জার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
চীনের বিরুদ্ধে যে সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছেন ট্রাম্প, তার প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন রবার্ট লাইথিজার। অবশ্য হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের আগের মেয়াদেও চীনের বিরুদ্ধে নেয়া তার ট্যারিফ নীতির অন্যতম নাটের গুরু হিসেবে মনে করা হয় লাইথিজারকে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
নিজের লেখা বইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনকে উল্লেখ করে, বেইজিংকে শায়েস্তা করতে তার রফতানি সীমিত করার পাশাপাশি চীনে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি পণ্যের রফতানি বন্ধের পক্ষে জোর অবস্থান তুলে ধরেছিলেন লাইথিজার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিষয়ক প্রধান নীতিনির্ধারকের দায়িত্ব পেলে, স্বভাবতই বেইজিংয়ের জন্য অস্বস্তি বয়ে আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্প সত্যি সত্যিই তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কঠোর ট্যারিফ নীতি আরোপ করলে তা শুধু চীনের অর্থনীতিকেই নয়, তার পাশাপাশি বেইজিংয়ের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এমন এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতিকেও আঘাত হানতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সাইন্সের গবেষণায় দেখা গেছে, যদি চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ৬০ শতাংশ ট্যারিফ কার্যকর হয়, তবে তা চীনের মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশকে সংকুচিত করবে। পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত ও ইন্দোনেশিয়া, যাদের সঙ্গে চীনের শক্তিশালী বাণিজ্যিক লেনদেন রয়েছে; তাদেরও অর্থনীতি যথাক্রমে শূন্য দশমিক শূন্য ৩ এবং শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশকে সংকুচিত হবে।
তবে শুধু বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই চীনবিরোধীদের দিয়ে নিজের প্রশাসন সাজাচ্ছেন না ট্রাম্প। সামরিক ক্ষেত্রেও এমন ব্যক্তিদেরই নেতৃত্বে আনছেন যারা কট্টর চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত। তাদের মধ্যে অন্যতম সিনেটর মার্কো রুবিও, যাকে নিজের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছেন ট্রাম্প।
বস্তুত মার্কো রুবিও হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যার নাম রয়েছে চীনের নিষেধাজ্ঞার তালিকায়। চীনের জিনজিয়াংয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করার কারণে ২০২০ সালে মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে চীন।
চীনের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত রুবিও একই সঙ্গে তাইওয়ানের সক্রিয় সমর্থকও বটে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাইওয়ান প্রশ্নে তিনি চীনকে একবিন্দু ছাড় দেবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে। এছাড়া সিআইএ প্রধান হিসেবে ট্রাম্প-মনোনীত র্যাটক্লিফও কট্টর চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত।
২০২০ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে নিজের লেখা কলামে তিনি চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বেইজিংকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। র্যাটক্লিফের পাশাপাশি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রাম্প-মনোনীত হেগসেথও চীনের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
সব মিলিয়ে শুধু বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামরিক দিক থেকেও নিজের পরবর্তী মেয়াদে চীনের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত থাকবেন ট্রাম্প, সেটা অনেকটাই আন্দাজ করা যায় তার প্রশাসন সাজানোর ধরণ দেখে।



আপনার মতামত লিখুন